Holika Dahan: Prahlad o Narasimha Avatarer Kahini

Share and Care

Demonic Pride

রাতটা যেন নিজের ভেতরেই গুটিয়ে আছে; আকাশে চাঁদ থাকলেও তার আলো প্রাসাদের দেয়ালে পৌঁছাতে সাহস পায় না। শুধু অগ্নিকুণ্ডের লাল আভা চারপাশে অস্থিরভাবে নড়ে ওঠে, মাটির ওপর লম্বা কাঁপা ছায়া এঁকে দেয়। এটি হোলিকা দহনের পবিত্র রাত, কিন্তু প্রাসাদের ভেতরে উৎসবের আনন্দ নেই—আছে এক অদ্ভুত অপেক্ষা। কখনো বাতাস ধীরে বয়ে আসে, কখনো হঠাৎ ঝাপটা দিয়ে আগুনকে উসকে দেয়; শিখা ওঠানামা করে যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি শ্বাস নিচ্ছে। দূরে ঢাকের শব্দ রাতের গভীরে মিলিয়ে যায়, আর উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যদের বর্মে আগুনের প্রতিফলন বারবার ঝলসে ওঠে। এটি কেবল শাস্তির রাত নয়—এটি ভবিষ্যদ্বাণী ও অহংকারের মুখোমুখি সংঘর্ষের রাত।

যখন প্রহ্লাদকে উঠোনে আনা হয়, তার পদক্ষেপে ভয়ের ছাপ নেই। রাজদরবারের লোকেরা ফিসফিস করে; কেউ চোখ নামিয়ে নেয়, কেউ কৌতূহলে তাকিয়ে থাকে। পরবর্তীতে যাকে হোলিকা দহনের কাহিনি হিসেবে স্মরণ করা হবে, সেই মুহূর্ত শুরু হয় আগুন দিয়ে নয়—বিশ্বাস দিয়ে। হিরণ্যকশিপু সিংহাসনের পাশে দাঁড়িয়ে, তার চোখে আগুনের থেকেও বেশি জ্বলছে ক্রোধ। “শেষবার বলছি,” তার গলা ভারী হয়ে ওঠে, “আমাকে ছাড়া আর কেউ নেই।” কিন্তু প্রহ্লাদ শান্তভাবে তাকিয়ে থাকে, যেন উত্তর তার অন্তরের গভীরেই লেখা আছে। হলিকা ধীরে এগিয়ে আসে, তার পদক্ষেপে আত্মবিশ্বাস, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। “আগুন আমাকে স্পর্শ করতে পারবে না,” সে বলে, আর তার কথার সাথে সাথে শিখাগুলো যেন আরও উঁচু হয়ে ওঠে।

অগ্নিকুণ্ডের চারপাশে বাতাস ঘুরতে থাকে; শিখা কখনো সোজা উঠে যায়, কখনো পাক খায়। ধোঁয়া উপরে উঠে আবার নিচে নেমে আসে, যেন আকাশ নিজেই এই ঘটনার সাক্ষী হতে ঝুঁকে পড়েছে। আগুন এক স্বরে জ্বলে না—কখনো ফিসফিস, কখনো গর্জন, কখনো এমন নীরবতা যে মনে হয় শিখাগুলোও শুনছে। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের মুখে আলো-ছায়ার খেলা, আর পাথরের উঠোন ধীরে ধীরে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

হলিকা প্রহ্লাদকে কোলে টেনে নেয়। এই প্রহ্লাদ ও হলিকারহলিকা মুখোমুখি সংঘর্ষ কেবল অগ্নিপরীক্ষা নয়—এটি ভক্তির পরীক্ষা। প্রহ্লাদের মুখে অদ্ভুত শান্তি; সে চোখ বন্ধ করে নীরবে প্রার্থনা করে। “তুমি এখনও তাকে ডাকছ?” হলিকা মৃদু হাসে, কিন্তু সেই হাসিতে এক মুহূর্তের অনিশ্চয়তা ঝলকে ওঠে। শিখাগুলো তাদের ঘিরে ফেলতে শুরু করে; আলো এত তীব্র হয়ে ওঠে যে চারপাশের সব মুখ ঝাপসা হয়ে যায়।


অগ্নিকুণ্ডে নিয়তির মোড় – হোলিকা দহনের প্রকৃত অর্থ

আগুন বেড়ে ওঠে।
শব্দ বদলে যায়।
বাতাস ভারী হয়ে ওঠে।

প্রথমবারের মতো হলিকার চোখে ভয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে; তার হাত শক্ত হয়ে যায়, শিখা তার পোশাক ছুঁয়ে যায়, কিন্তু প্রহ্লাদের চারপাশে আগুন যেন ভিন্নভাবে নাচছে। কাঠ ভাঙার শব্দ, ধোঁয়ার ঘূর্ণি, আর মানুষের দম বন্ধ করা নীরবতা একই দৃশ্যে জমাট বাঁধে। আগুনের ভিতর যেন কিছু নড়ে ওঠে—স্পষ্ট নয়, কিন্তু উপস্থিতির অনুভূতি এত প্রবল যে সৈন্যদের কেউ কেউ পিছিয়ে যায়।

হঠাৎ এক চিৎকার রাতকে ছিন্নভিন্ন করে।

তারপর আবার নীরবতা।

শিখা ধীরে নিচু হয়ে আসে। ধোঁয়া সরে গেলে দেখা যায় প্রহ্লাদ অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে। হোলিকা দহনের সেই মুহূর্তে আগুন নিজেই বিচারক হয়ে ওঠে—অহংকারকে ভস্ম করে, ভক্তিকে রক্ষা করে। হলিকার অবয়ব ছাই হয়ে মাটিতে পড়ে থাকে, বাতাস সেটিকে তুলে ছড়িয়ে দেয়। কেউ কথা বলে না, কিন্তু সেই নীরবতা যেন আকাশের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়।


হিরণ্যকশিপুর মুখে অবিশ্বাস জমে ওঠে; তার শ্বাস ভারী হয়ে যায়। এই ঘটনার মোড় তার অহংকারের ভিত কাঁপিয়ে দেয়। “অসম্ভব…” তার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। প্রহ্লাদ ধীরে চোখ খোলে, যেন সে আগেই জানত এই মুহূর্ত আসবে। বাতাস ঠান্ডা হয়ে এসেছে, তবু মাটির তাপ এখনও জ্বলছে।

“তোর ঈশ্বর কোথায়?” হিরণ্যকশিপু গর্জে ওঠে, বিশাল স্তম্ভের দিকে ইঙ্গিত করে। “তিনি সর্বত্র,” প্রহ্লাদ শান্তভাবে উত্তর দেয়। “এই স্তম্ভে?” সে এগিয়ে গিয়ে পাথরের উপর মুষ্টাঘাত করে। স্তম্ভ কেঁপে ওঠে, ধুলো ঝরে পড়ে, আর এক মুহূর্তের জন্য চারপাশের বাতাস থেমে যায়।


অসুরের হাসি, নিয়তির অপেক্ষা

প্রাসাদের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা নেমে আসে; শিখা স্থির হয়ে থাকে, যেন সময় নিজেই দম আটকে আছে। সবাই স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রহ্লাদ এক পা পিছিয়ে যায়, চোখে বিস্ময় নয়—প্রত্যাশা। হিরণ্যকশিপু আবার আঘাত করে। পাথরের ভিতর ফাটল ছড়িয়ে পড়ে। গভীর থেকে ভেসে আসে এক অদ্ভুত শব্দ—না মানুষ, না পশু, তবু দুটোরই।

শব্দটি আবার হয়।
আরও জোরে।
পাথর কেঁপে ওঠে।

সৈন্যরা পিছিয়ে যায়। ধুলো ঘূর্ণি তুলে ওঠে। আলো ভেঙে যায়। ফাটল আরও বড় হয়। অন্ধকার নড়ে ওঠে। গর্জন এবার স্পষ্ট—এত গভীর যে মাটিও কেঁপে ওঠে।


নরসিংহ অবতার: যখন সময় পুনর্লিখিত হলো

narasimha

স্তম্ভ ভেঙে যায় এক মুহূর্তে। ধুলো আর আগুনের বিশৃঙ্খলার মধ্য থেকে উঠে আসে এক ভয়ংকর রূপ—অর্ধেক মানুষ, অর্ধেক সিংহ। তিনি নরসিংহ অবতার, অহংকারের বিরুদ্ধে দেবশক্তির প্রকাশ। তার চোখে আগুনের প্রতিফলন, কেশর বাতাসে উড়ছে, আর এক গর্জনে প্রাসাদের ছাদ কেঁপে ওঠে। সময় যেন থেমে যায়।

হিরণ্যকশিপু আক্রমণ করে, কিন্তু নরসিংহ ঝড়ের মতো এগিয়ে আসে। পাথর ভাঙার শব্দ, গর্জন, সংঘর্ষ—সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ দৃশ্য। গোধূলির সেই সীমানায়, না ভেতরে না বাইরে, নরসিংহ তাকে ধরে ফেলেন। মুহূর্ত দীর্ঘ হয়। তারপর বজ্রগতিতে শেষ আঘাত নেমে আসে—অহংকার ভেঙে পড়ে, সময় নতুনভাবে লেখা হয়।

সব থেমে যায়। আগুন নিভে আসে। সৈন্যরা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ে। প্রহ্লাদ এগিয়ে আসে, চোখে ভয় নয়—শ্রদ্ধা। নরসিংহের ক্রোধ ধীরে শান্তিতে পরিণত হয়।

“পিতা…” প্রহ্লাদ মৃদুস্বরে বলে। বাতাস নরম হয়ে আসে। গর্জন মিলিয়ে যায় নিঃশ্বাসে।


রাত ধীরে ভোরের দিকে এগোয়। আগুনের জায়গায় ছাই পড়ে থাকে। ভাঙা স্তম্ভ, ছিন্ন সিংহাসন—সব যেন এক গল্পের শেষে দাঁড়িয়ে আছে। হোলিকা দহনের এই কাহিনি কেবল একটি ঘটনার বিবরণ নয়—এটি বিশ্বাসের জয়গান।

প্রহ্লাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। হোলিকা দহন উৎসবের গভীর অর্থ আজও বেঁচে আছে—ভক্তি টিকে থাকে, অহংকার পুড়ে যায়, আর দেব-ন্যায় চিরকাল প্রতিষ্ঠিত হয়।

বাতাস ধীরে বয়ে যায়।
ছাই উড়ে উঠে আবার নিচে নামে।
কেউ কিছু বলে না।

তবু মনে হয়—সবকিছু বলা হয়ে গেছে।


Share and Care

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top